আইপি এড্রেস কি? আইপি এড্রেস কিভাবে কাজ করে

আমরা জানি ইন্টারনেট একটি যোগাযোগ মাধ্যম যা বিশ্বব্যাপী কাজ করে। ইন্টারনেট সঠিক ভাবে কাজ করার জন্য আমাদের যেমন সাবমেরিন ক্যাবলের প্রয়োজন হয় তেমনি নেটওয়ার্কিং এরও প্রয়োজন পরে। ইন্টারনেট অনেকগুলো ডিভাইস এবং টেকনোলজির সমন্বয়ে তার কার্যক্রম পরিচালনা করে। কিন্তু ইন্টারনেট কীভাবে কাজ করে বা সঠিকভাবে ইন্টারনেট ইউজ করতে আমাদের কি কি বিষয় অবশ্যই জানতে হবে তা নিয়ে বিস্তারিত ধারণা আমাদের মাঝে খুব কম থাকে। কারণ আমরা এসব বিষয় আইএসপির হাতে ছেড়ে দেই। নিরাপদ ভাবে ইন্টারনেট ইউজ করার জন্য আমাদের অন্যান্য বিষয়ের সাথে আইপি অ্যাড্রেস সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা রাখতে হবে। তো চলুন আজকে আইপি এড্রেস কি? আইপি এড্রেস কিভাবে কাজ করে এগুলো নিয়ে আলোচনা করা যাক।

আইপি এড্রেস কি?

আইপি অ্যাড্রেস বা ইন্টারনেট প্রোটোকল হলো ইন্টারনেটে একটি সচল নেটওয়ার্কের পরিচিতি এবং কাজ করার ধরণ। অর্থাৎ আপনি কোন ডিভাইস থেকে যখন ইন্টারনেটের সাথে সংযুক্ত হন তখন তা একটি ইউনিক অ্যাড্রেস ইউজ করে। সহজ করে বলতে গেলে আমাদের সবার বাসার যেমন আলাদা আলাদা ঠিকানা থাকে এই আইপি অ্যাড্রেস ঠিক তেমন। ধরুন আমি যদি আপনাকে একটি পার্সেল পাঠাতে চাই তাহলে শুধু আপনার গ্রামের নাম দিয়ে পাঠালে কিন্তু তা আর আপনার কাছে যাবে না। আমাকে আপনার গ্রাম, ইউনিয়ন, জেলা, বিভাগ, বাসার নাম্বার ইত্যাদি সহ ফুল ঠিকানা দিতে হবে। তাহলেই পার্সেল সরাসরি আপনার বাসার গেটে গিয়ে পৌঁছাবে।

যাহোক, আইপি এর সম্পূর্ণ রুপ হলো ইন্টারনেট প্রোটোকল। সহজ ভাবে বর্ণনা করতে গেলে আমাদের ইন্টারনেট কীভাবে কাজ করে সে সম্পর্কে জেনে নিতে হবে। আমরা জানি ইন্টারনেট হলো একটি ডাটা আদান প্রদান মাধ্যম। অর্থাৎ আমরা যে কোন ওয়েবসাইট ভিজিট করলে যে তথ্য দেখি তা আসলে কোন সার্ভার থেকে ডাউনলোড করা তথ্য। এখন এই ডাটা আসলে কোথায় থাকে? ডাটা গুলো সংরক্ষিত থাকে অনলাইন সার্ভারে। আমরা যখন একটি ওয়েবসাইট ভিজিট করি তখন ওই ওয়েবসাইট এর অ্যাড্রেস ব্রাউজারে এন্টার করি। তো যখন ব্রাউজারে এন্টার করি তখন ব্রাউজার ওয়েবসাইট লিংক কে আইপি অ্যাড্রেসে কনভার্ট করে ডিএনএসের মাধ্যমে পুরো ইন্টারনেট সার্চ করে। ওই আইপি অ্যাড্রেস যে সার্ভারে আছে সেখানে গিয়ে রিকোয়েস্ট করা পেজ আমাদের সামনে প্রদর্শিত করে।

এখন আমাদের ঠিকানা যেমন এলাকার নাম সহ আরও কিছু তথ্য সহকারে তৈরি করা হয়। ইন্টারনেটে ঠিক এভাবেই প্রতিটি ইন্টারনেট ইউজারের ঠিকানা আইপি অ্যাড্রেস দ্বারা চিহ্নিত করে। মোটকথা আইপি অ্যাড্রেস হলো ইন্টারনেট দুনিয়ায় আপনার একটি ঠিকানা। যা ব্যবহার করে আপনার সাথে যে কেউ ডাটা আদান প্রদান করতে পারবে।

আইপি এড্রেস কিভাবে কাজ করে

আইপি অ্যাড্রেস কিভাবে কাজ করে তা জানার আগে আমাদের আইপি অ্যাড্রেসের ভার্সন সম্পর্কে জেনে নিতে হবে। আইপি অ্যাড্রেসের বর্তমানে দুইটি ভার্সন আছে। এক আইপিভি৪ যা আইপি বলতে আমরা সচরাচর একেই বুঝি এবং দুই আইপিভি৬, যা এখনো তেমন পপুলারিটি পায়নি।

আইপিভি৪ 

আইপিভি৪ হলো একটি ৩২ বিট নির্ভর অ্যাড্রেসিং সিস্টেম। যার মোট ৪ টি অংশ থাকে যার ভ্যালু ০ থেকে ২৫৫ পর্যন্ত। অর্থাৎ প্রত্যেকটি সেকশন আলাদা আলাদা ভাবে ০ থেকে ২৫৫ পর্যন্ত সংখ্যা ষ্টোর করে। একটি আইপিভি৪ অ্যাড্রেস দেখতে 192.168.23.10 এরকম হয়।

হার্ড ডিস্ক কি? হার্ড ডিস্কের কাজ কি? হার্ডডিস্ক কত প্রকার

আইপিভি৪ অ্যাড্রেসিং সিস্টেম ৩২ বিট হওয়ার কারণে সর্বোচ্চ ৪ বিলিয়ন ইউনিক অ্যাড্রেস জেনারেট করতে পারে। কিন্তু বর্তমানে গোটাবিশ্বে মোট ইন্টারনেট ইউজার ৪.৫৫ বিলিয়ন। তার মানে ইতিমধ্যে আইপি অ্যাড্রেস শেষ হয়ে গেছে। তাহলে আমরা তারপরেও কিভাবে আইপিভি৪ ইউজ করতে পারছি? এটি সম্ভব হয়েছে এনএটি (NAT) নেটওয়ার্ক অ্যাড্রেস ট্র্যান্সলেসন টেকনোলজির কারণে। এর প্রধান কাজ হচ্ছে একটি হোস্ট আইপি অ্যাড্রেসের ভিতরে আরও লোকাল আইপি অ্যাড্রেস তৈরি করা।

এটি শুধু একটি ইউনিক হোস্ট আইপি থেকে আরও কয়েকটি ইউনিক লোকাল আইপি অ্যাড্রেস তৈরি করে। সহজ করে বলতে গেলে ধরুন আপনার একটি রাউটারের আন্ডারে ২ টি মোবাইল এবং ১ টি ল্যাপটপ চলে। এখন আপনি যদি মোবাইল থেকে ফেসবুক এবং ল্যাপটপ থেকে ইউটিউব ব্রাউজ করেন তাহলে ব্রাউজার এই দুইটি রিকোয়েস্ট প্রথমে পাঠাবে রাউটারে। তারপর রাউটার আলাদা আলাদা লোকাল আইপি থেকে পাওয়া রিকোয়েস্ট হোস্ট আইপি ইউজ করে সার্ভারে পাঠাবে। সার্ভার থেকে ডাটা রিসিভ করে রাউটার সেই ডাটা রিকোয়েস্ট আসা লোকাল আইপি গুলোতে সেন্ড করবে। এতে আপনার ডাটা আদান প্রদান কিন্তু একটি আইপি থেকেই সম্পন্ন হয়েছে।

আইপিভি৬ 

আইপিভি৪ এর উন্নত এবং আধুনিক ভার্সন হলো আইপিভি৬। পুরনো ভার্সন থেকে এর যেমন ধারন ক্ষমতা বেশি তেমনি আইভিপি৬ অনেক শক্তিশালী। আইপিভি৬ ১২৮ বিট অ্যাড্রেসিং সিস্টেম সাপোর্ট করে। একারনে এর ইউনিক অ্যাড্রেস তৈরি করার ক্ষমতা অগণিত। অর্থাৎ সংখ্যায় হিসেব করতে গেলে প্রায় (340,282,366,920,938,463,463,374,607,431,768,211,456) এতগুলো ইউনিক অ্যাড্রেস তৈরি করা যাবে। মোটকথা আইপিভি৬ কখনো শেষ হবে না। কারণ সেখানে যদি NAT সিস্টেম ইউজ করা হয় তাহলে একটি ইউনিক অ্যাড্রেস দিয়েই আপনার বাসার সকল ডিভাইস কভার করা সম্ভব।

একটি আইপিভি৬ অ্যাড্রেস সাধারণত
(2001:0db8:85a3:0000:0000:8a2e:0370:7334) এরকম হয়। এখন পর্যন্ত আইপিভি৬ অ্যাড্রেস ঢালাও ভাবে ইউজ করা শুরু হয়নি। কারণ আইপিভি৬ পুরোপুরি ভাবে কাজ করানোর জন্য সার্ভার, ডোমেইন অ্যাড্রেস, ব্রডব্যান্ড ইত্যাদি সব জায়গায় ইউজ করতে হবে। ধীরে ধীরে আইপিভি৪ ছেড়ে অনেকেই আইপিভি৬ ইউজ করার দিকে ঝুঁকছে। কিন্তু এই হিউজ পরিমাণ ইউজার একবারে মুভ করা সম্ভব নয়। অন্যদিকে আইপিভি৬ এর স্পীড আইপিভি৪ এর থেকে অনেক ফাস্ট। যা ইন্টারনেট ইউজের গতি অনেক বাড়িয়ে দেবে।

আমরা ইতিমধ্যে আইপি এর ভার্সন সম্পর্কে জানলাম। এখন আইপি অ্যাড্রেস কীভাবে কাজ করে সে সম্পর্কে একটু আলোচনা করা যাক। আসলে ইন্টারনেট ইউজ করতে চাইলে আমাদের আইপি অ্যাড্রেস লাগবেই। কারণ ইন্টারনেটে ডাটা আদান প্রদান করার যত গুলো পদ্ধতি আছে সেগুলো সব আইপি ইউজ করেই ট্র্যান্সফার করে। কারণ আইপি যেহেতু সার্ভার এবং ক্লাইন্ট এর পার্সোনাল ঠিকানা সেহেতু ডাটা ভুলে অন্য কোথাও যাওয়ার সুযোগ নেই। 

মোট কথা আমরা যে যে ওয়েবসাইট ইউজ করি সেগুলো প্রত্যেকটির ডোমেইন নেমের সাথে আইপি অ্যাড্রেস অ্যাড করা থাকে। এখন আপনার কোন ডিভাইস যদি ইন্টারনেট কানেক্ট করেন তাহলে সেই ডিভাইসে একটি আইপি অ্যাড হয়। 

ডেস্কটপ কিনবেন? না ল্যাপটপ কিনবেন?

ওয়েব ব্রাউজারে আপনি কোন ওয়েব অ্যাড্রেস লিখে এন্টার করলে তা প্রথমে রাউটারে যায়। তারপর সেখান থেকে WAN এ ওয়েবসাইট এর আইপি দিয়ে বিভিন্ন ডিএনএস এ সার্চ করে। পরে ডিএনএস উক্ত আইপিকে কাছাকাছি সার্ভারে প্রেরণ করে। সে সার্ভার আইপি ভেরিফাই করে ডাটা প্যাকেট আকারে আবার রিটার্ন পাঠায়। সে ডাটা WAN থেকে রাউটার দিয়ে হোস্ট আইপি তে প্রবেশ করে ওই হোস্ট এর মেম্বার আইপিতে রিসিভ হয়। এই পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় ইন্টারনেট প্রোটোকল ইউজ করে।

যদি আইপি না থাকতো তাহলে ডাটা সেন্ড এবং রিসিভ করার জন্য কোন রিসিভার পাওয়া যেত না। তখন সফলভাবে ইন্টারনেট ইউজ করা যেত না এবং পুরো যোগাযোগ ব্যবস্থা অকেজো হয়ে পরতো। আইপি ছাড়াও আরও অনেক প্রোটোকল আছে যেমন এফটিপি, টিসিপি, এইচটিটিপি, এসএমটিপি ইত্যাদি। এখানে প্রতিটি প্রোটোকলের আলাদা আলাদা কাজ করে। এসব প্রোটোকল গুলো আইপির সমন্বয়ে কাজ করে। আশাকরি আইপি নিয়ে লেখা এই আর্টিকেল পুরো কনসেপ্ট ক্লিয়ার করে দিয়েছে। আইপি নিয়ে যদি আরও কোন প্রশ্ন থেকে থাকে তাহলে অবশ্যই কমেন্ট বক্সে জানাবেন ধন্যবাদ।  

Leave a Reply

%d bloggers like this: